Total Pageviews

Saturday, October 19, 2013

স্লিপ ওয়াকিং বা ঘুমিয়ে হাঁটা

শবনমকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছে তার রুমমেটরা। ভার্সিটি পড়ুয়া মেয়ে এখনো ঘুমের ঘোরে রুমের বাইরে চলে যায়, নিজের মনে কথা বলে, কাঁদে, আবার ঘুমিয়ে পড়ে আপনাতেই।
এইদিকে ছোট্ট মেয়ে হৃদির বাবা মায়েরও হয়েছে এমন দুশ্চিন্তা, সে ঘুমের মাঝে হেটে বাড়ির বাইরে চলে যায়, ঘুমিয়ে পড়ে যেখানে সেখানে। আবার ঘুম থেকে উঠে তার কিছুই মনে থাকে না, কি করেছে, কোথায় গিয়েছে কিছুই সে মনে করতে পারে না। কি বিপদ এখন বাড়ির সবার!

শবনম বা হৃদির যে সমস্যার জন্য তাদের বাবা-মা উদ্বিগ্ন তার একটি সুন্দর নাম দিয়েছেন মনোবিদেরাঃ সমনাবুলিজম(Somnambulism) বা ঘুমিয়ে হাঁটা, ইংলিশে স্লিপ ওয়াকিং। আমরা অনেকেই এই শব্দটির সাথে পরিচিত, হয়তো হরহামেশাই ব্যবহার করে ফেলছি শব্দটি কিন্তু জানা হচ্ছে না স্লিপ ওয়াকিং এর মূল বিষয় সম্পর্কে।

যদিও মনোবিদ্যায় স্লিপ ওয়াকিং এর একটি গাল ভরা নাম সমনাবুলিজম(Somnambulism) দেয়া হয়েছে,  তবে আমরা একে স্লিপ ওয়াকিং বলেই আলোচনা করবো আজ। সাধারনত ছোটদের মাঝে দেখা গেলেও বড়রাও আক্রান্ত হয় এটা দ্বারা।

ঘুমের মাঝে হাঁটা যেহেতু তাই আগে ঘুম নিয়ে কিছু কথা বলা যাক। আমাদের ঘুমের প্রধান দুটি ধাপ রয়েছে। র‍্যাপিড আই মুভমেন্ট(REM) এবং নন র‍্যাপিড আই মুভমেন্ট(Non REM)
ঘুমের প্রথমে আসে নন রেম ঘুম। এটা ৪টি পর্যায়ে বিভক্ত। দ্বিতীয় পর্যায়ে আসে রেম ঘুম যার দুটি উপ-পর্যায় রয়েছে।
রেম ঘুমে চোখের পেশীর সংকোচন বাড়ে, চোখ নাড়াচাড়া করতে থাকে এসময়, নন রেম ঘুমে চোখের পেশীর নাড়াচাড়া কমে আসে। মানুষ স্বপ্ন দেখে রেম ঘুমের সময়, যখন দেখবেন কারো ঘুমের মাঝে তার চোখ নড়ছে, চোখের পাতা কাঁপছে বুঝে নেবেন সে স্বপ্ন দেখছে ওই সময়ে।
আমাদের আলোচ্য স্লিপ ওয়াকিং ঘটে ঘুমের নন রেম পর্যায়ের ৩য় ও ৪র্থ ধাপে।
যারা স্লিপ ওয়াকিং করে থাকেন তারা আর সকলের মতোই ঘুমোতে যান বিছানায়, ঘুমিয়ে পড়েন ঠিক মতোই। কয়েক ঘন্টার মাঝেই শুরু হয় আসল খেলা!! তারা কথা বলা শুরু করেন আপন মনে, হয়তো কাঁদেন বা চিৎকার করেন, উঠে পড়েন ঘুম থেকে। চোখ খুলে তাকান, কিন্তু চেহারা থাকে ভাবলেশহীন, অভিব্যক্তিহীন। কারণ তারা তো আসলে জেগে নেই, চোখ খুলেছেন ঠিকই কিন্তু তার মস্তিস্ক রয়ে গেছে ঘুমের রাজ্যে। তিনি কি করছে, কি বলছেন, কোথায় যাচ্ছেন সব করছেন  নিজের অজান্তে।
হয়তো ঘরের মাঝে হাঁটছে সে, দরজা খুলে যাইরে চলে যাচ্ছে, যেখানে সেখানে ঘুমিয়ে পড়ছে নিজের অগোচরে, কাপড় পরছে বা খুলছে, প্রাত্যহিক অন্যান্য কাজ ও করছে; সবই সেই নন রেম ঘুমের মাঝেই।
এমন সময় তাদেরকে সজাগ করতে গেলে হয়তো অনেকে প্রচণ্ড বিক্ষিপ্ত আচরন করেন, চিৎকার করেন, ধাতস্থ হতে সময় লাগে তাদের।
সকলের মাঝে একটা বিষয়ে মিল থাকে যে তারা ঘুম ভেঙ্গে আর মনে করতে পারেন না ঘুমের মাঝে কি কি করেছেন বা বলেছেন।
কেন হয় এমন আজব ব্যাপার? ঘুমের মাঝে হাটা? আমাদের তো হচ্ছে না, তবে কিছু মানুষের কেন হবে?
এ ব্যাপারে কিছু কারণের কথা বলা হয়েছেঃ

  • খুব ক্লান্ত দেহে বিছানায় গেলে, সারাদিন অধিক খাটখাটুনি হলে,
  • উত্তেজনা, ভয়, মানসিক অস্থিরতা থাকলে,
  • প্রতিদিনের ঘুম যদি হয় অনিয়মিত ও অপর্যাপ্ত,
  • স্লিপ এপনিয়া বা ঘুমের মাঝে বিশেষ ধরনের শ্বাস বদ্ধতা থাকলে,
  • কিছু ঔষধের কারণেও ঘটতে পারে এমন ব্যাপার।

আবার পরিবারে কারো থেকে থাকলে অর্থাৎ বাবা বা মার থেকে থাকলে সন্তানদেরও স্লিপ ওয়াকিং করার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

চোখের সামনে কাউকে স্লিপ ওয়াকিং করতে দেখলে অথবা পরিচিত কারো এমন সমস্যা হলে তার থেকে নিষ্ক্রান্ত হওয়ার উপায় জানতে চায় না মন? ধরুন বাড়িতেই কারো ধরা পড়লো এমন ব্যাপার, তাহলে? জেনে রাখা ভালোঃ
প্রথমেই হতে হবে সতর্ক,  একা থাকতে দেয়া ঠিক হবে না এদেরকে। অনেকে দরজা খুলে বাইরে চলে যায়, রেলিং টপকে পরে যায় নীচে অথবা রাস্তায় নেমে দুর্ঘটনায় পতিত হয়। এদের জন্য ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করার সাথে বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন যেন বাইরে যেতে না পারে।
হাঁটতে দেখলে তাদেরকে বিছানায় নিয়ে যান, আবার শুইয়ে দিন মমতা মিশিয়ে। প্রয়োজনে ডেকে দিতে পারেন, ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিতে পারেন, এতে বারণ নেই ডাক্তারের।
অনেকের প্রয়োজন হতে পারে কিছু ওষুধের তার ঘুমকে নিয়ন্ত্রনের জন্য, কিছু ওষুধ খেলে স্লিপ ওয়াকিং হতে পারে, এসব ড্রাগ ব্যবহার বন্ধ করে দেখা যায়।
স্লিপ এপনিয়া একটা শ্বাসবদ্ধতার সমস্যা যা ঘুমের মাঝে হয়। স্লিপ এপনিয়ার চিকিৎসা করলে অনেকের স্লিপ ওয়াকিং সমস্যার সমাধান হয় বলে গবেষণায় প্রকাশ পেয়েছে।
জীবনযাপনের কিছু পরিবর্তন এ ব্যাপারে কাজে আসতে পারে বলে জানা যায়।

ঘরে রাখা যাবে না কোন ধরনের ধারালো বস্তু, ছুরি, কাঁচি ইত্যাদি। অনেক বাসায় বাচ্চারা বাঙ্ক বিছানায় ঘুমায়, এসব ক্ষেত্রে বাঙ্কে দেয়া যাবে না, শুতে হবে সাধারণ খাটে। বাঙ্কে দিলে উপরে থেকে পড়ে যাবার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।
বিছানায় যেতে হবে বেশ আগেই। ঘুম কম হলে অনেকের  এমন সমস্যা হতে পারে, তাই শান্তির ঘুমের ব্যবস্থা রাখতে হবে। ঘুমের জন্য রাখতে হবে পর্যাপ্ত সময়। প্রতিদিন একই সময়ে বিছানায় যাবার অভ্যাস করতে হবে।
বাচ্চাদের বাবা মায়েরা একটা ডাইরি করতে পারেন, প্রতিদিন বাচ্চা কখন ঘুমোতে যাচ্ছে এবং কখন তার সমস্যার শুরু হচ্ছে সেটা লিপিবদ্ধ শুরু করুন। কিছু দিন গেলে দেখা যাবে একটা প্যাটার্ন মানছে আপনার বাচ্চা। সেই প্যাটার্ন অনুযায়ী স্লিপ ওয়াকিং শুরু হওয়ার ১০-১৫ আগে তাকে উঠিয়ে দিন, ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিন। ৫ মিনিট জাগিয়ে রেখে আবার ঘুম পড়িয়ে দিন। এভাবে অভ্যাস পরিবর্তনের ফলে কাজ হতে পারে।

এত কিছু লেখা দেখে মোটেও ভয় পাওয়ার কিছু নেই। স্লিপ ওয়াকিং খুব কম মানুষেরই হয় এবং এটা মোটেও মারাত্নক কিছু নয়। শুধুমাত্র সচেতনতা এবং যত্নবান হলেই আক্রান্ত ব্যক্তিকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব। একসময় নিজে থেকেই ভালো হয়ে যাবে আমাদের শবনম, হৃদির মতো আরো অনেক স্লিপ ওয়াকার। তারাও উপভোগ করবে শান্তির ঘুম, মধুর ঘুম। নিদ্রাদেবীর আশীর্বাদে তাদের কপালেও চাঁদ মামা দিয়ে যাবে টিপ।
Share:

0 comments:

Post a Comment

Follow by Email

স্বাস্থ্য কথা. Powered by Blogger.

Blog Archive