Total Pageviews

Tuesday, November 12, 2013

রক্ত জমাট না বাঁধা বা হিমোফিলিয়া!

হিমোফিলিয়া কী?


হিমোফিলিয়া জন্মগত বংশানুক্রমিক রক্তের এক বিশেষ রোগ। এই রোগে রক্তের জমাট বাধার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। 


সাধারণত শরীরের কোথাও কেটে গেলে বা আঘাতপ্রাপ্ত স্থান থেকে রক্ত বের হলে কয়েকটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পাঁচ থেকে আট মিনিটের মধ্যে রক্ত জমাট বাঁধে। রক্ত জমাট বাঁধার জন্য অণুচক্রিকা ছাড়াও ১৩টি উপাদান প্রয়োজন। এই উপাদানগুলোকে ‘ফ্যাক্টর’ বলে। এদের মধ্যে আট ও নয় নম্বর ফ্যাক্টরে ঘাটতি দেখা দিলে রক্তের জমাট বাধায় সমস্যা দেখা দেয়। ঘাটতির মাত্রা অনুযায়ী প্রকাশ পায় রোগের তীব্রতা। এই ফ্যাক্টর গুলো যদি ৩০ শতাংশের নিচে নেমে যায় তাহলে রক্ত জমাট বাধার সমস্যা দেখা দিতে শুরু করে। এমনকি এক পর্যায়ে শরীরের অভ্যন্তরে নিজে নিজেই রক্ত ক্ষরণ হতে শুরু করে।

দু'ধরণের হিমোফিলিয়া আছ। হিমোফিলিয়া-এ ও হিমোফিলিয়া-বি। ফ্যাক্টর আট-এর অভাব হলে তাকে হিমোফিলিয়া এ বলে। ফ্যাক্টর নয় এর অভাব হলে তার নাম হিমোফিলিয়া বি। 'হিমেফিলিয়া বি' কে ক্রিসমাস ডিজিজও বলা হয়। পৃথিবীতে যত হিমোফিলিয়া রোগী আছ তার ৮৫ শতাংশই হিমোফিলিয়া এ-এর রোগী। 

 

এ রোগে কেন হয়?

হিমোফিলিয়া ঘুমন্ত এক ধরণের জেনেটিক রোগ। শরীর এক্স- ক্রোমজমের বিশেষ একটি জিনের মিউটেশন থেকে এই রোগের সূত্রপাত হয়। মূলত: মেয়েরা এর বাহক। আর পুরুষরা এর শিকার। কারণ মেয়েদের শরীর থাকে দু'টি এক্স-ক্রোমজম আর পুরুষের একটি। তবে ক্ষেত্র বিশেষে মেয়েরাও এর শিকার হতে পারে। 

আমাদের দেহের কোষে মোট ২৩ জোড়া ক্রোমোজম থাকে। এর মধ্যে এক জোড়া ক্রোমোজম লিঙ্গ নির্ধারণ করে। মেয়েদের কোষে থাকে এক্স এক্স এবং ছেলেদের কোষে এক্স ওয়াই ক্রোমোজম। হিমোফিলিয়া জিন থাকে এই এক্স ক্রোমোজমের মধ্যে। এক্স ক্রোমোজম হচ্ছে হিমোফিলিয়া রোগের বাহন। যেহেতু মেয়েরা দুটো এক্স ক্রোমোজমের অধিকারী, তাই একটা রোগাক্রান্ত হলে অন্য এক্স ক্রোমোজম ভালো থাকে বলে সহজে মেয়েরা এ রোগে ভোগে না। ছেলেদের বেলায় একটা এক্স ক্রোমোজম থাকে। সেটা যদি হিমোফিলিয়া রোগ বহনকারী হয়, তাহলে ছেলেদের এ রোগ থেকে মুক্তি নেই। হিমোফিলিয়ার জিন বহনকারী নারীদের সাধারণত ‘ক্যারিয়ার’ বা বাহক বলা হয়। 


রোগের লক্ষণঃ

 মূলত: রক্ত ক্ষরণই এর প্রধান লক্ষণ। অধিকাংশ রোগীরাই কোন অপারেশনের পর বা দূর্ঘটনাজনিত আঘাতের পর যখন আর রক্তক্ষরণ বন্ধ হয় না তখনই রোগটি সম্পর্কে প্রথম জানতে পারে। শিশুদের খাতনা করার পর অনেক শিশুদের রক্ত ক্ষরণ বন্ধ হতে সময় বেশী লাগে। তখনও এই রোগের চিন্তা মাথায় আসে। রোগের মাত্রা অনুযায়ী প্রকাশ পায় আরো কিছু লক্ষণ। ফ্যাক্টর দু'টির ঘাটতি বেশি হলে নিজে নিজেই বা সামান্য আঘাতে রক্ত ক্ষরণ হতে পারে হাঁটুতে, কনুইয়ে। এমনকি গভীর মাংসেও। এর থেকে অস্থি সন্দির কর্মক্ষমতাও নষ্ট হতে পারে। 

এছাড়াও শরীরের অন্যান্য অংশেও রক্ত ক্ষরণ হতে পারে। বিশেষ করে মস্তিষ্কে, গলার ভিতরে, গলায় রক্তক্ষরণ হওয়া সবচেয়ে মারাত্মক। এতে সঠিক সময়ে সঠিক চিকিত্সা ব্যবস্থা না নিলে হিমোফিলিয়া রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। তাই সময় থাকতেই রোগটি সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে যাওয়া ভাল। অন্তত: সাবধান থাকলে মৃত্যুর ঝুঁকিটা কমানো যায়। 


কী ধরনের এবং কোথায় বেশি রক্তক্ষরণ হয়ঃ

ক্ষতস্থান থেকে রক্ত পড়া সহজে বন্ধ না হওয়া সব হিমোফিলিয়া রোগীর বৈশিষ্ট্য। ক্ষতস্থান থেকে অল্প অল্প রক্ত চলবে কয়েক দিন থেকে সপ্তাহব্যাপী। শরীরের যেকোনো জায়গা থেকে হঠাৎ রক্ত পড়া শুরু হতে পারে, মুখের ভেতর দাঁতের কামড় লেগে অথবা ত্বকের নিচে দেখা গেল নীল জখম হয়ে গেছে একটু আঘাতেই। ক্ষত যদি বেশি হয় তাহলে জায়গাটা ফুলে উঠবে, ব্যথা হবে, এমনকি জ্বরও হতে পারে। অনেকের আবার দাঁত তুলতে গিয়েই ধরা পড়ে রোগটা। দাঁত তোলার পর রক্ত পড়া সহজে বন্ধ হয় না। সবচেয়ে মারাত্মক হয় মাথায় আর অস্থিসন্ধিতে রক্তক্ষরণ হলে। অস্থিসন্ধিতে, বিশেষ করে হাঁটুতে রক্তক্ষরণ হলে হাঁটু ফুলে উঠবে, ব্যথা হবে, রোগী হাঁটতে পারবে না। এ অবস্থায় চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী চিকিৎসা না করালে সারা জীবনের জন্য পঙ্গু হওয়ার ঝুঁকি থাকে। 

শিশুদের ক্ষেত্রে গোড়ালির অস্থিসন্ধি বেশি আক্রান্ত হয়। অনেক সময় বড়দের বেলায় প্রস্রাবের সঙ্গেও রক্ত পড়তে পারে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে রোগী রক্তস্বল্পতা ও আর্থ্রাইটিসে ভোগে। শরীরের অতি প্রয়োজনীয় অঙ্গের ওপর-যেমন মস্তিষ্ক, হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস ইত্যাদির ওপর অনেক সময় জমাট রক্তের চাপ পড়লে স্মায়বিক দুর্বলতা হতে পারে। মোট কথা, শরীরে যেকোনো জায়গায় রক্তক্ষরণের ফলে বিভিন্ন ধরনের যেসব উপসর্গ হতে পারে, তা রক্তের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে। 


কিভাবে জানা যায়?

রক্তের ফ্যাক্টর দু'টির পরীক্ষা (ফ্যাক্টর অ্যাসে) রক্তের জমাট বাধার ক্ষমতা পরীক্ষা (বিটি, সিটি, পিটি, এপিটিটি) করলে রোগটি ধরা পড়ে। গর্ভাবস্থায় ভ্রুণের ডিএনএ পরীক্ষা করে গর্ভস্থ শিশুর রোগ সম্পর্কে জেনে নেওয়ার ব্যবস্থা আছে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা এখনো দুরের স্বপ্ন। 


চিকিত্সাঃ

রোগটি শিশু বয়সে নির্ণয় করা না গেলে কখনো চিকিৎসার অভাবে আবার কখনো বা ভুল চিকিৎসার কারণে অকালে মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। আজ পর্যন্ত এ রোগের স্থায়ী কোনো চিকিৎসা আবিষ্কৃার হয়নি। তবে যে ফ্যাক্টরগুলোর স্বল্পতা ও অনুপস্থিতির কারণে রক্তক্ষরণ হয় সেগুলো শিরা পথে ইনজেকশন- এর মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করানোই উত্তম চিকিত্সা। এই ফ্যাক্টর এর দাম অনেক বেশী প্রায় ৩৫০০ থেকে ৮৫০০ টাকা পর্যন্ত। অনেক ক্ষেত্রে সবধরনের ফ্যাক্টর বাংলাদেশে পাওয়াও যায় না। কোন কোন ক্ষেত্রে কজুলেশন ফ্যাক্টর এর বিপরীতে ইনহিবিটর তৈরী হয়। 

সে ক্ষেত্রে বেশী বেশী ফ্যাক্টর এর দরকার পড়ে অথবা বিবলতা ওষুধের মাধ্যমে চিকিত্সা করতে হয়। যা কিনা বাংলাদেশে পাওয়া যায় না। নিয়মিত রক্তরোগ বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে থেকে মাসে মাসেই এর মাত্রা বুঝে নিয়ে সাবধানতা অবলম্বন করে ভালো থাকা সম্ভব।

বিশ্বজুড়ে হিমোফিলিয়া সারা পৃথিবীতে প্রতি ১০,০০০ জনে একজন হিমোফিলিয়াসহ অন্যান্য  রক্তক্ষরণ রোগে ভুগছে। সনাক্ত করা সম্ভব হয়নি এমন রোগীর সংখ্যা আরো বেশী। সনাক্তকৃত রোগীদের ৭৫ শতাংশই কোন চিকিত্সার আওতায় আসতে পারে না অর্থাত্ এরা সুচিকিত্সা থেকে বষ্ণিত। চিকিত্সায় রক্ত পরিসঞ্চালক করতে হয় বলে অনেক রোগী মারা যায় রক্ত বাহিত রোগ (যেমন হেপাটাইটিস, এইডস ইত্যাদি) ও পরিসঞ্চালন জনিত জটিলতায়।

আপনাদের সুখী জীবনই আমাদের কাম্য। ধন্যবাদ।

Share:

0 comments:

Post a Comment

Follow by Email

স্বাস্থ্য কথা. Powered by Blogger.

Blog Archive